২২ বছর গৃহকর্মীকে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ: সংবাদ সম্মেলনে কুমু বেগমের ন্যায়বিচারের দাবি, কাফরুল থানায় মামলা

স্টাফ রিপোর্টার

দীর্ঘ ২২ বছর গৃহকর্মী হিসেবে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, বিনা বেতনে শ্রম আদায় এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলে প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কুমু বেগম। রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি তার জীবনের দীর্ঘ নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে কুমু বেগম দাবি করেন, পরিবারহীন হয়ে পড়ার পর ২০০৫ সালে মাত্র ৭ বছর বয়সে তাকে ঢাকার কাফরুল থানার উত্তর ইব্রাহিমপুর এলাকার মুন্সি বাড়ির বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর লতিফ (৫০)-এর বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমদিকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করানো হলেও পরবর্তীতে দীর্ঘদিন ধরে তাকে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানো হয় এবং নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে জাহাঙ্গীর লতিফ তার ওপর যৌন নির্যাতন চালান। ভয় ও অসহায়ত্বের কারণে দীর্ঘদিন বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেননি বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান তিনি।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে একাধিকবার বাসার ভেতরে আটকে রাখা হয়। এমনকি একবার টানা তিন দিন তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। বিয়ের বয়স হলে বিয়ের খরচ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরে তা রক্ষা করা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তাকে কোনো অর্থ বা নিরাপত্তা ছাড়াই চট্টগ্রামগামী একটি বাসে তুলে দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।

কুমু বেগম আরও অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীর লতিফের স্ত্রী এবং দুই কন্যা—জেবা রাইসা ও দিয়া রাইসা—বিভিন্ন সময় তার ওপর মানসিক চাপ ও নির্যাতন চালাতেন, যাতে তিনি বাসা ছাড়তে বাধ্য হন।

তিনি দাবি করেন, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর লতিফ বর্তমানে উত্তর ইব্রাহিমপুর এলাকায় নিজ বাসভবনে অবস্থান করছেন এবং তার নামে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে পাঠানো আইনি নোটিশে শ্রম আইনের আওতায় ১৯ বছরের বকেয়া বেতন (মাসিক ৩,০০০ টাকা হিসাবে) ৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং বিয়ের খরচ বাবদ প্রতিশ্রুত ২ লাখ টাকাসহ মোট ৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় কুমু বেগম বাদী হয়ে কাফরুল থানায় জাহাঙ্গীর লতিফের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার নম্বর ১০৬/২০২৬। মামলায় প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনের ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয় যে, জাহাঙ্গীর লতিফ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। সেখানে আরও দাবি করা হয়, মিলন নামে এক ব্যক্তি জাহাঙ্গীর লতিফের একান্ত সহযোগী ও ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এছাড়া জাহাঙ্গীর লতিফকে কেন্দ্রীয় এক রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বিভিন্ন আর্থিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও অভিযোগ করা হয়। আরও অভিযোগ করা হয় যে, ৫ আগস্ট মিরপুরে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর লতিফ, মিলন এবং সাচ্চুর বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *