হরমুজ প্রণালীতে ‘চুইয়ে’ বের হচ্ছে তেল: সিএনএন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান যুদ্ধের কারণে গত তিন মাস ধরে কার্যত অচল বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী। এর জেরে ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকট চলছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু তারপরও কেন তেলের বাজার এখনও তুলনামূলক শান্ত? এটি যেন এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত তিন মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত চলছে। এর জেরে ইরান বন্ধ করে দিয়েছে হরমুজ প্রণালী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ। এতে হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আশঙ্কার তুলনায় তীব্রভাবে বাড়েনি।

মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগানের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগের তুলনায় বর্তমানে এই পথে দৃশ্যমান জাহাজ চলাচল নেমে এসেছে মাত্র ১৫ শতাংশে।

তবে বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এখনও বড় ধরনের সংকটের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে একটি কারণ হতে পারে- হরমুজ প্রণালীর ওপর আরোপিত কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও কিছু পরিমাণ তেল গোপনে বা নজর এড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

‘গোপন প্রবাহ’ সামলাচ্ছে বাজারের ধাক্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু তেলবাহী জাহাজ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে নজরদারি এড়িয়ে হরমুজ প্রণালী পার হচ্ছে। এসব তেল পরিবহনকে বলা হচ্ছে ‘ক্ল্যান্ডেস্টাইন ফ্লো’ বা গোপন প্রবাহ।

জেপি মরগানের তথ্যানুযায়ী, মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহে প্রতিদিন প্রায় ২১ লাখ ব্যারেল তেল এভাবে পরিবহন হয়েছে। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ ব্যারেল তেল যেতো। সেই তুলনায় এই পরিমাণ কম হলেও বৈশ্বিক বাজারে চাপ কমানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জেপি মরগানের বৈশ্বিক পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা এক নোটে লিখেছেন, “নৌ অবরোধ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বড় পতন সত্ত্বেও আশ্চর্যজনক পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য এখনও হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হচ্ছে।”

‘ভূতের মতো’ জাহাজ চলাচল
র‌্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকন্যালি বলেন, গোপন তেল পরিবহন সংকটকে কিছুটা বিলম্বিত বা কম তীব্র করতে পারে।

তিনি বলেন, “আমরা ধারণা করেছিলাম যুদ্ধের পর হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন শূন্য থেকে ১০ শতাংশে নেমে আসবে। কিন্তু এই গোপন প্রবাহের কারণে প্রকৃত পরিমাণ কিছুটা বেশি হতে পারে।”

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই প্রবাহ সংকট পুরোপুরি এড়ানোর মতো যথেষ্ট নয়, বরং এটি শুধু বাজারের ওপর চাপ কিছুটা কমাচ্ছে।

পাইপার স্যান্ডলারের বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতিবিদ ও কৌশলবিদ জান স্টুয়ার্টের হিসাব অনুযায়ী, মে মাসে প্রতিদিন প্রায় ২৯ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে বের হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২১ লাখ ব্যারেল এমন জাহাজ বহন করেছে, যেগুলো ইরানি সংস্থাকে ফি দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রায় ৯ লাখ ব্যারেল ছিল ‘ভূতের মতো’ পরিবহন- অর্থাৎ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে অন্ধকারে চলাচল করা জাহাজ।

স্টুয়ার্ট বলেন, “এই গোপন প্রবাহ সংকট সামলাতে সাহায্য করছে। বাস্তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা আমার ধারণার চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।”

চীনের আমদানি কমানোও বড় কারণ
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি ৯৩ ডলারে নেমে আসে। যুদ্ধের আগে যেখানে দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার, সেখানে এটি বেশি হলেও সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ ১১৪ ডলারের তুলনায় কম।

তবে বাজার স্থিতিশীল থাকার পেছনে শুধু গোপন তেল পরিবহনই নয়, আরও কয়েকটি কারণ কাজ করছে।

পাইপার স্যান্ডলারের হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল তেল পারস্য উপসাগর থেকে বিকল্প পথে বের হচ্ছে। এর বড় অংশ যাচ্ছে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে, যা দেশটির তেলক্ষেত্রগুলোকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এছাড়া বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ চীন তেল আমদানি কমিয়ে দিয়েছে এবং নিজেদের বড় মজুত থেকে চাহিদা পূরণ করছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ সংকটের চাপ কিছুটা কমেছে।

জেপি মরগানের কানেভা বলেন, চাহিদা কমে যাওয়া এবং প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মজুত পরিস্থিতি সামাল দিতে ভূমিকা রাখছে। তার মতে, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকা মানে এই নয় যে সংকট ছোট; বরং বাজার ব্যয়বহুল উপায়ে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে।

সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে
তবে কিছু জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, বাজার বর্তমানে বিকল্প ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত ঝুঁকি পুরোপুরি বুঝতে পারছে না। যুদ্ধ শুরুর পর বাণিজ্যিক তেলের মজুত দ্রুত কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত ১৯৮০-এর দশকের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে।

জান স্টুয়ার্ট সতর্ক করে বলেন, “পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে যাচ্ছে।”

তিনি পূর্বাভাস দিয়ে বলেছেন, জুলাই ও আগস্টে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলারে উঠতে পারে। এমন হলে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম প্রতি গ্যালন ৫ ডলারের বেশি হতে পারে, যেখানে বর্তমানে তা প্রায় ৪ দশমিক ২০ ডলার।

স্টুয়ার্টের মতে, আরও জরুরি তেল ছাড়তে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ব্যবহার কমাতে হলে তেলের দাম দ্রুত বাড়ার প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি বলেন, “মানুষকে পরিবর্তনে রাজি করাতে হবে। আর দাম বেশি হলে সেটি করা অনেক সহজ হয়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িকভাবে বাজারকে স্থিতিশীল রাখলেও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *