বিশেষ প্রতিনিধি :
যশোরের শার্শা ও বেনাপোল সীমান্তজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে সোনা চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের এক ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে যুবদল নেতা শহিদুল ইসলাম শহিদ ওরফে “গোল্ড শহিদ” ওরফে “ছোট শহিদ”-এর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয়, বিপুল অর্থ ও প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে তিনি এখন সীমান্ত এলাকার অন্যতম বিতর্কিত ও ভয়ঙ্কর ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, তার এই অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই শুরু হয় ভয়ভীতি, হুমকি, নির্যাতন, এমনকি গুম ও হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনা। স্থানীয় অনেকেই নিরাপত্তার শঙ্কায় প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। তবে গোপনে তারা জানিয়েছেন, “সীমান্ত এলাকায় এখন শহিদের অনুমতি ছাড়া কিছুই হয় না।”
দিনমজুর সাগরের রহস্যজনক মৃত্যু, পরিবারের বিস্ফোরক অভিযোগ। সম্প্রতি সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার দক্ষিণ ভাদলী গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর সাগর (৩৩)-এর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় আসে “গোল্ড শহিদ”-এর নাম।
নিহতের পরিবার বাবা দাবী করেছে, সাগর দীর্ঘদিন ধরে শহিদের হয়ে সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন অবৈধ কাজ করতেন। বিশেষ করে “প্যাকেট” পৌঁছে দেওয়ার কাজ ছিল তার দায়িত্ব। পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, এসব “প্যাকেট” মূলত সোনা চোরাচালানের কাজে ব্যবহৃত হতো।
নিহত সাগরের বাবা আব্দুল হান্নান জানান,
তার ছেলে সাগর, জাকির ও আরো ২/৩ জনকে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর শহিদের ডানহাত খ্যাত মেরুল্লা মেম্বার একটি হায়েস গাড়িতে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে ইকবাল মেম্বারসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। পরে শহিদ ও তার লোকজন সাগরের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়।
তিনি বলেন,
“আমার ছেলেকে এমনভাবে মারধর করা হয়েছিল যে তাকে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। পরে আহত অবস্থায় দক্ষিণ ভাদলী এলাকায় ফেলে রেখে যায়। পরদিন আমরা তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু ১১ ডিসেম্বর সে মারা যায়।”
নিহতের বাবার অভিযোগ,
সাগরের মৃত্যুর পর শহিদের লোকজন হাসপাতাল থেকে মরদেহ, ডেথ সার্টিফিকেট ও চিকিৎসাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয়। একই সঙ্গে পরিবারকে মামলা না করার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“আমরা খুব গরিব মানুষ। ওরা বলেছে মামলা করলে আমাদের সবাইকে শেষ করে দেবে। তাই এখনো ভয়ে কিছু করতে পারিনি।”
স্থানীয় সূত্র ও নিহতের পরিবারের দাবি অনুযায়ী,
সাগর, জাকির ও আরও কয়েকজন শহিদের হয়ে সীমান্ত এলাকায় সোনা বহনের কাজ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, মেরুল্লা মেম্বারের মাধ্যমে তারা একটি “প্যাকেট” বাবুল হাজীর কাছে পৌঁছে দেন। পরে সেই প্যাকেট ভারতীয় মহাজনের কাছে পাঠানো হয়।
কিন্তু ঘটনার কয়েকদিন পর বাবুল হাজী ও মেরুল্লা মেম্বার সাগরের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। তাদের অভিযোগ ছিল, মূল সোনার পরিবর্তে নকল সোনা দেওয়া হয়েছে। এরপরই সাগরের ওপর নির্যাতন শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তার মৃত্যু ঘটে।
স্থানীয়দের ধারণা,
সোনা চোরাচালান চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
এক সময়ের রাখাল, এখন সীমান্তের কোটি কোটি টাকার মালিক!
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে শহিদের উত্থানের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,
একসময় তিনি মানুষের বাড়িতে দিনমজুর ও রাখালের কাজ করতেন। পরে ধীরে ধীরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ফ্যাসিস্ট আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় সীমান্তভিত্তিক সোনা চোরাচালান চক্রে প্রবেশ করেন।
এরপর রাজনৈতিক পরিচয় ও অর্থের জোরে তিনি দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, যশোর জেলা যুবদলের একাধিক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই তার উত্থান আরও দ্রুত হয়।
একাধিক সূত্রের দাবি,
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শহিদ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। বেনাপোল সীমান্তের সোনা ও মাদক চোরাচালানের বড় অংশ তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন,
“এখন সীমান্ত এলাকায় কার মাধ্যমে কী যাবে, কত টাকায় যাবে—সবকিছু শহিদের নিয়ন্ত্রণে।”
মাদক, সোনা ও ভয়ঙ্কর নির্যাতনের ‘স্টিম রোলার’
এলাকাবাসীর অভিযোগ,
শুধু সোনা চোরাচালান নয়, মাদক ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করেন শহিদ ও তার সিন্ডিকেট। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক আনার সঙ্গেও তার নাম জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া কেউ তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুললেই শুরু হয় ভয়ভীতি ও নির্যাতন। স্থানীয় কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
অনেককে অপহরণ করে মারধর করা হয়েছে। কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে পালিয়েও গেছেন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,
“শহিদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। কারণ সবাই জানে, প্রতিবাদ করলেই বিপদ।”
রাজনৈতিক প্রভাব ও বিতর্কিত সম্পর্কের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি,
যশোর জেলা যুবদলের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার সঙ্গে শহিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বারবার ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
এমনকি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কিছু নেতার সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সীমান্ত এলাকায় সেই প্রভাব অটুট রয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে শহিদ ও তার সিন্ডিকেট নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে।
পরে কেন্দ্রীয় যুবদল অভিযুক্তদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং সশরীরে উপস্থিত হয়ে জবাব দিতে বলা হয়। পরবর্তীতে অভিযোগ তদন্তে দুই সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
তবে অভিযুক্তরা সাংবাদিক সম্মেলন করে নিজেদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা দাবি করেছেন,
তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
শার্শা, বেনাপোল, কলারোয়া ও আশপাশের এলাকার অনেক সাধারণ মানুষ এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ,
অবৈধ অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রশাসনের অনেক স্তরেও ভয় ও প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলছেন।
একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“এলাকায় এখন সাধারণ মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন।”
বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
নিহত সাগরের পরিবার, স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ জনগণ এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। তারা অভিযোগ করেছেন,
সীমান্ত এলাকায় সোনা চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
তারা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—
সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা এই ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
— পরবর্তি পর্ব আগামী সংখ্যায়
