মা ইলিশ রক্ষায় কঠোর অবস্থানে কোস্ট গার্ড

ডেস্ক নিউজঃ ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নির্বিঘ্ন রাখতে মাছ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি জোরদার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। সমুদ্র ও নদ-নদীতে টহল, জেলেদের সচেতন করা এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ইলিশ সংরক্ষণে কাজ করছে সংস্থাটি।

মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে গত ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ এবং ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ সময়ে ইলিশের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের চারটি জোনের আওতাধীন বিভিন্ন স্টেশন ও আউটপোস্ট থেকে নদ-নদী, উপকূলীয় এলাকা ও সমুদ্রসীমায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

তবে, নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে জেলেদের জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ৩৮ জেলার ১৬৮টি উপজেলার মোট ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৯০টি জেলে পরিবারের জন্য প্রতি ২৫ কেজি হারে চাল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তার মধ্যে- ঢাকা বিভাগে ৬৫ হাজার ৭১৭ জন, বরিশাল বিভাগে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫১৬ জন,  চট্টগ্রাম বিভাগে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৯৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮ হাজার ১৬৩ জন, খুলনা বিভাগে ১৮ হাজার ৭৬২ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৯ হাজার ৪১১ জন এবং রংপুর বিভাগে ১৬ হাজার ১২৬ জন।

কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, সংস্থাটির আওতাধীন ১৬টি জেলার ৫৪টি উপজেলায় মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত ও বিশেষ টহল এবং সন্দেহজনক নৌযান ও মাছ ধরার বোটে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে চাঁদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাটের শরণখোলা ও বগী, চট্টগ্রামের বহির্নোঙর এলাকা এবং লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও কমলনগরে তুলনামূলক বেশি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

অভিযানে জাল, মাছ ও নৌকা জব্দ

নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ৮৩ লাখ ৩০ হাজার ৯০০ মিটার জাল, ১৫৫ কেজি ইলিশ মাছ ও ১৪টি নৌকা জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড। এসব ঘটনায় জড়িত ২৪ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, মৎস্য প্রতিনিধির উপস্থিতিতে জব্দ করা জাল বিনষ্ট করা হয়েছে। জব্দ করা ইলিশ মাছ স্থানীয় এতিমখানায় বিতরণ এবং নৌকাগুলো সংশ্লিষ্ট মৎস্য কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ আহরণ বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশের মাছ ধরার ট্রলার যাতে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ আহরণ করতে না পারে, সেজন্য টহলরত জাহাজগুলোকে সতর্ক অবস্থানে রেখে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে।

দুর্গম এলাকায় অবৈধ মাছ শিকার ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ

মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে দুর্গম নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকায় রাতের আঁধারে গোপনে মাছ ধরা এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে কোস্ট গার্ড।

সংস্থাটি জানিয়েছে, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিয়মিত টহল, বিশেষ অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

জেলেদের সচেতন করতে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ

শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, মা ইলিশ সংরক্ষণে জেলেদের সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে কোস্ট গার্ড। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকলে ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে জেলেদের বোঝানো হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এবং জেলেরাও বেশি পরিমাণে ইলিশ আহরণের সুযোগ পাবেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণ বন্ধ রাখা এবং প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষিত রাখা এ মাছের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার পাশাপাশি অবৈধ মাছ শিকারের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন।

নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন বা এ-সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়মের তথ্য জানাতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ কল করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মা ইলিশ সংরক্ষণে চলমান এ অভিযানের সফলতা নির্ভর করছে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতার ওপর। প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখা গেলে ভবিষ্যতে এ মাছের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বৃদ্ধির পথ আরও সুগম হবে।

এ বিষয়ে ভোলার চরফ্যাশনের জেলে বুরহান উদ্দিন বলেন, ইলিশের উৎপাদন ও বংশবিস্তার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার ফলে ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার নির্বিঘ্ন হবে। এতে জেলেরাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। এ সময়ে জেলেদের জীবনযাত্রায় যেন কষ্ট না হয়, সেজন্য সরকার খাদ্যসহায়তাও প্রদান করছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি প্রশংসনীয় ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরী বলেন, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকার ২২ দিনের যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ উদ্যোগ। তবে ইলিশের প্রজনন সুরক্ষা আরও কার্যকর করতে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২২ দিন থেকে বাড়িয়ে এক মাস করা প্রয়োজন। কারণ, নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ডিমওয়ালা ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়তে দেখা যায়।

তিনি বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণে কোস্ট গার্ডের ভূমিকা প্রশংসনীয়। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে একশ্রেণির অসাধু জেলে আইন অমান্য করে ইলিশ শিকারে নামেন। এ সময়ে কোস্ট গার্ডের নিয়মিত টহল ও অভিযান অবৈধভাবে ইলিশ আহরণ বন্ধ এবং মা ইলিশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ আহরণ বন্ধে নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি রক্ষায় এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সবাই মিলে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলি এবং মা ইলিশ রক্ষার মাধ্যমে সুনীল অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে সহায়তা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *